সন্দেশখালি জেগেছে
সন্দেশখালি জেগেছে
নিধুভূষণ দাস
সন্দেশখালি ভাল নেই।কেন বলছি এই
কথা?ওখানকার আমজনতাই বলছেন, তারা ভাল
নেই,রেখেঢেকে নয়,সোজাসুজি,ক্যামেরার সামনে অন দ্য রেকর্ড।কি বলছেন তারা- মেয়ে পুরুষ সবাই? বলছেন, তাদের জমি ডাকাতি হওয়ার কথা,মেয়েদের সম্ভ্রম লুটের কথা,গণধর্ষণের কাহিনি।তারা সন্ত্রস্ত।দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে তাদের,দিনের পর দিন অত্যাচারিত হতে হতে।বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে এইসব কথা প্রচারিত হয়েছে,হচ্ছে।
সন্দেশখালি কোথায়,ওখানে কি আইনের শাসন চলেনা,এইরকম নানা প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক,উঠছেও। জায়গটি পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনায়,ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী।
এলাকাটি নিম্ন গাঙ্গেয় ব-দ্বীপে অবস্থিত ইছামতি-রায়মঙ্গল সমভূমির একটি অংশ । এলাকা জুড়ে অসংখ্য খাল ও নদী।এলাকার একটি বড় অংশ সুন্দরবনের বসতিগুলির অংশ । জনসংখ্যার মাত্র ১২.৯৬%শহরে বাস করে এবং ৮৭.০৪% থাকে গ্রামীণ এলাকায়। এলাকায় চাষের জমি ও মাছের ভেরি রয়েছে।ভেরি কেন্দ্রিক অপরাধচক্রও সক্রিয় দশকের পর দশক ধরে।অত্যাচরিতরা সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন অনেক কথা যাদিয়ে বোঝা যায় ওখানে বরাবর সন্ত্রাসের শাসন চলে,ধারাবাহিকভাবে অপরাধচক্রের অত্যাচার চলে,মানবাধিকার অস্বীকৃত হয়,শোষিত হয় আমজনতা।কখনো এই চক্রের মাথা শেখ শাজাহান,তার ডান হাত, বাঁ হাত শিবু হাজরা,উত্তম সর্দার,কখনো অন্যরা।অর্থাৎ এই অপরাধচক্রের নেতৃত্ব বদল হয় কিন্তু চক্রটি অক্ষয় অব্যয়।
কিভাবে তা অক্ষয় অব্যয় থাকছে?সন্দেশখালি কি তবে রাষ্ট্রব্যবস্থার বাইরে কোন নৈরাজ্যের এলাকা,যেমন মায়ানমার,থাইল্যান্ড ও লাওস এই তিনটি দেশেরই উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সীমান্তে দুই লক্ষ বর্গ কিমি পার্বত্য অঞ্চলের গোল্ডেন ট্রায়েঙ্গেলের আফিম চাষ ও মাদক উৎপাদনের মুক্তাঞ্চল।একসময় গোল্ডেন ট্রায়েঙ্গলে বেতাজ বাদশা ছিল মঙ্গ টাই আর্মির খুন সা,এখন যেমন সন্দেশখালির শেখ শাহজাহান।
সন্দেশখালিতে পুলিশ আছে,সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নেই,শাহজাহানরা আছে,সরকার নেই,অরাজকতা আছে,স্পষ্টতঃই আইনের শাসন নেই।বছরের পর বছর এই অবস্থা।কোন রাষ্ট্র কি তার কর্তৃত্ব এমনভাবে অরাজকতার কাছে সমর্পণ করে থাকতে পারে? কিন্তু সন্দেশখালিতে তাই ঘটে চলেছে।ওখানে শাহজাহানের বাড়িতে তদন্তে গিয়ে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার আধিকারিকরা ও সঙ্গের কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা আক্রান্ত হন কিন্তু রাজ্য পুলিশ শাহজাহানকে খুঁজে পায়না,ছুঁতে পারেনা।শুধু হম্বিতম্বি করতে পারে নিরীহ অত্যাচারিত গ্রামবাসীদের উপর।দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার পর গ্রামবাসীরা যখন অন্যায় আর অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার তখন পুলিশ তাদের দমনে তৎপর,অথচ দিনের পর দিন যখন তারা অত্যাচারিত,শোষিত,নির্যাতিত হয়,তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়,মা-বোনদের ইজ্জত লুন্ঠিত হয় তখন পুলিশ জেগে ঘুমায়।এই হলো নৈরাজ্যের সন্দেশখালি।এই হলো নৈরাজ্যের কারণ।
সন্দেশখালি একটি যুক্তরাষ্ট্রের ভূখন্ডের অংশ।রাষ্ট্রটির নাম ভারত।এর অঙ্গরাজ্য পশ্চিমবঙ্গের একটি এলাকা সন্দেশখালি।আইন-শৃঙ্খলা রাজ্যের বিষয়।সন্দেশখালির নৈরাজ্যের প্রত্যক্ষ দায় কার? অবশ্যই রাজ্য সরকারের।কেন্দ্রের কি কোন দায় নেই? যদি না থাকে তবে কেন্দ্রকে স্বীকার করে নিতে হবে যে, পশ্চিমবঙ্গের উপর কেন্দ্রের আপৎকালীন হস্তক্ষেপের কোন সাংবিধানিক ব্যবস্থা নেই।
প্রশ্ন উঠতে পারে,এই ক্ষেত্রে আপৎকাল কি?রাষ্ট্রীয় জীবনে নৈরাজ্য কি আপৎকাল নির্দেশ করেনা?সন্দেশখালিতে স্পষ্টতঃই মেীলিক নাগরিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়ে আসছে।ক্রমাগত ব্যাপকভাবে নাগরিকের মেীলিক অধিকার লঙ্ঘন যদি দুঃসময় বলে মনে না হয় তবে রাষ্ট্র সাংবিধানিক ব্যবস্থার প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখবে কীভাবে?
কেন্দ্র ও রাজ্য উভয়েই যদি চোখ বুঁজে থাকে তবে এব্যাপারে নাগরিক সমাজ হয়তো বিচার বিভাগের সক্রিয়তা কাম্য বলে মনে করতে পারে।সরকারের কার্যনির্বাহী বিভাগ যখন মেীলিক অধিকার রক্ষায় ব্যর্থ হয় তখন হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এগিয়ে আসতে হয়, আসেও। সন্দেশখালির ক্ষেত্রে কি অবশেষে শীর্ষ আদালতকে ভূমিকা নিয়ে কেন্দ্র ও রাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তরকে সবক শেখাতে হবে?
পুনশ্চ:সরকারের নির্বাহী বিভাগ রাজনৈতিক অংক কষে কাজ করে। জনগণ যখন জেগে ওঠে তখন এই অংকের হিসাব মিলেনা।
Comments
Post a Comment