পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি ও অধোগতি
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি ও অধোগতি
নিধুভূষণ দাস
অঘ্রানের প্রথম দিবসে ত্বরায় আসা বিকেলে ছাদে বসে কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপ লাবন্য দেখতে দেখতে ভাবছিলাম,"আমরা কেন এমন অনাবিল,অপাপবিদ্ধ নই?স্বার্থবুদ্ধি কেন নীচতা ও অনাচারকে প্রশ্রয় দেয়?জনসেবার নামে কেন আত্মসেবায় মগ্ন হই?হিংসার দানব কেন খুনোখুনির রাজত্ব কায়েম করতে পারে,চারিদিকে নাগিনীদের বিষাক্ত নিঃশ্বাস কেন?"
এইরকম উল্টাপাল্টা সাতপাঁচ ভাবনার মধ্যেই অনীক এসে হাজির।সোৎসাহে বললো,"আরেক মন্ত্রী গ্রেপ্তার হয়েছে।এবার বনমন্ত্রী।"
"কেন,আবার কি হল?"
"রেশন দুর্নীতি মামলায়।তিনি আগে খাদ্যমন্ত্রী ছিলেন কিনা!"
অনীকটা কাঞ্চনজঙ্ঘার ধবল চূড়ার সেীন্দর্য উপভোগের আনন্দটাই মাটি করে দিল।আগে দেখতাম রাজনৈতিক নেতা,মন্ত্রীটন্ত্রীরা রাজনৈতিক কারনে গ্রেপ্তারটেপ্তার হতেন।এখন দিন পাল্টেছে,রাজনীতি পাল্টেছে,রাজনীতিতে অভিজাত মনের ত্যাগী মানুষ বিরল।
দুর্নীতি,মিথ্যাচার,অনাচার,হিংসা ও ঔদ্ধত্য রাজনীতিকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে যেন।অনেক ক্ষেত্রে রাজনীতি পারিবারিক হয়ে ওঠায় গণতন্ত্রের হাঁসফাঁস অবস্থা।দুর্জনেরা বলে,রাজনীতি এখন বিনিয়োগ ছাড়া পুঁজিপতি হওয়ার সেরা উপায়।কথাটা অমূলক নয়।চারপাশে তাই তো দেখতে পাই।
"রাজনীতি" কথাটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ কি?রাজতন্ত্রের স্মৃতি কি Politics-এর পরিভাষা "রাজনীতি" করতে ভাষাবিদদের প্রণোদিত করেছিল?উইলিয়াম কেরি তার বাংলা অভিধানে রাজনীতি শব্দের অর্থ করেছেন রাজন্য (the king) + নীতি (justice), অর্থাৎ রাজার ন্যায়বিচার।কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার ভিত্তিতে গঠিত সামাজিক সম্পর্ক নিয়ে রাজনীতি।ল্যারি হার্ডিম্যানের(সম্ভবত ব্যাঙ্গ করে বলা)মতে,রাজনীতি' শব্দটি 'পলি', যার অর্থ 'অনেক' এবং 'টিকস', যার অর্থ 'রক্ত চোষা পরজীবী' শব্দ দুটি থেকে এসেছে।
বলতে বাধা নেই, রাজনীতির লোকদের দেমাক ও বৈভবের আস্ফালন এখন সাধারণ অভিজ্ঞতা।জিরো থেকে হিরো হওয়ার সহজ উপায় রাজনীতিতে ঢুকে পড়া।অনেক ক্ষেত্রেই পার্টির পদাধিকারী,পঞ্চয়েত সদস্য,পুর প্রতিনিধি থেকে বিধায়ক,সাংসদ,মন্ত্রী সবারই রাজার মত চালচলন,হাবভাব।আমাদের গণতন্ত্রে যেন নব্য রাজতন্ত্রের আবির্ভাব ঘটেছে।তার উপর আবার পরিবার কেন্দ্রিক দলের রমরমা। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক,আমরা কি সত্যি সত্যি রিপাবলিকান(সাধারণতন্ত্রী) নাকি রাজতন্ত্রী।
গণতন্ত্রে তথ্যভিত্তিক জনমত গড়ে ওঠা জরুরি।আমাদের সংবিধান বাক স্বাধীনতা ও মতামত প্রকাশের মেীলিক অধিকার দিয়েছে,রয়েছে সংবাদ মাধ্যমের স্বধীনতার স্বীকৃতিও।কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে মূল ধারার সংবাদ মাধ্যম সঠিক তথ্যভিত্তিক জনমত গঠনে কতটা ইচ্ছুক সে নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে।কয়েকটা ইউটিউব চ্যানেল যথাসাধ্য ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে সচেষ্ট।নিরপেক্ষ জনমত গঠনের ক্ষেত্রে একদা বুদ্ধিজীবী সমাজ বড় ভূমিকা নিত।এখন এরা কেীশলগতভাবে সরব কিংবা নীরব থাকে।
ঊনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরনের বাংলায় এখন আবার রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্রেরও আবির্ভাব ঘটেছে,অর্থপূর্ণ গণতন্ত্র যেন অপসৃয়মান।শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মত গুরুত্বপূর্ণ খাতের অবক্ষয় ভয়ঙ্কর।যাদের আর্থিক ক্ষমতা আছে তারা সন্তানদের সরকারী স্কুলে পাঠান না,স্কুল শিক্ষার পর অনেকেই রাজ্যের বাইরে চলে যায় উচ্চ শিক্ষা নিতে।
বাংলার এই অধোগতি শুরু হয় ১৯৭০-এর দশকে,এখন এর গতি ভয়ঙ্করভাবে বেড়েছে।অভিযোগ,এখানে এখন চাকরি বিক্রি হয়।
এই অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়ার পর পদ হারানো শিক্ষামন্ত্রী জেলবাসী।
আসলে এর মূলে রয়েছে আমাদের অতি মাত্রায় রাজনীতি প্রেম আর অর্থনীতিকে অবজ্ঞা করার মানসিকতা।আর এই রাজনীতি তথ্যভিত্তিক জনমত রহিত এবং অজ্ঞতা বা বিকৃত তথ্য নির্ভর।
Comments
Post a Comment